ক্ষমতার পালাবদলে মানুষ আশা করেছিলেন দ্রব্যমূল্য কমবে। নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তের অনেক দিনের দীর্ঘশ্বাস আর থাকবে না। কিন্তু ব্যবসায়ীদের নানা মারপ্যাঁচে তা সম্ভব হয়ে উঠছে না। শীত প্রায় চলে এসেছে। মানুষ আশা করছিলেন এ সময়টিতে শীতের সবজির দাম কম থাকবে। কিন্তু বাজারে এখনো চড়া দামে বিক্রি প্রায় সব ধরনের সবজি। একইভাবে মাছের দাম চড়াই আছে। সপ্তাহ ব্যবধানে কেজিতে ৪০০-৫০০ টাকা বেড়েছে ইলিশের দাম। তবে কেজিপ্রতি ১০ টাকা কমেছে মুরগির দাম।
এদিকে নিত্যপণ্যের দাম কমাতে সরকারের শুল্ক ছাড় ও আমদানির উদ্যোগের পুরোপুরি সুফল এখনো পাচ্ছেন না ভোক্তারা। চাল, চিনি, খোলা ভোজ্যতেল, ডিম ও পেঁয়াজের মতো কিছু পণ্যের দর কমেছে। তবে আলু, বোতলজাত সয়াবিন তেল, খেজুরসহ কয়েকটি পণ্য আগের মতো বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।
শুক্রবার (২৯ নভেম্বর) রাজধানীর একাধিক বাজার ঘুরে এমনটি দেখা গেছে।
দেশের ইলিশের বাজার এখন অস্থির। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে সুস্বাদু এ রুপালি মাছ। সপ্তাহ ব্যবধানে কেজিতে ৪০০-৫০০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে এক কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে দুই হাজার ২০০ টাকায়। এ ছাড়া দেড় কেজি ওজনের ইলিশ তিন হাজার টাকা, ৭০০-৮০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ এক হাজার ৯০০ টাকা হারে, আর ৫০০-৬০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ এক হাজার ৪০০ টাকা ও ৩০০-৪০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের জন্য গুনতে হচ্ছে ৮০০ থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত।
বিক্রেতারা বলছেন, বাজারে চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত মাছ না আসায় দাম বাড়ছে। ইলিশের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতায় বাইরে চলে যাচ্ছে।
কেজিতে ১০-৩০ টাকা বেড়ে গেছে অন্যান্য মাছের দামও। বাজারে প্রতি কেজি রুই ৩৮০ থেকে ৪৫০ টাকা, কাতল ৪০০ থেকে ৪৮০ টাকা, চাষের শিং ৫৫০ টাকা, চাষের মাগুর ৫০০ টাকা, চাষের কৈ ২৪০ থেকে ২৮০ টাকা, কোরাল ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকা, টেংরা ৫৫০ থেকে ৭০০ টাকা, চাষের পাঙাশ ১৮০ থেকে ২৩০ টাকা ও তেলাপিয়া ১৮০ থেকে ২২০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।
এ ছাড়া প্রতি কেজি বোয়াল ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকা, পোয়া ৪৫০, পাবদা ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকা, আইড় ৮৫০ থেকে ৯০০ টাকা, দেশি কৈ এক হাজার ৩০০ টাকা থেকে এক হাজার ৭০০ টাকা, শিং এক হাজার ৪০০ থেকে এক হাজার ৫০০ টাকা, শোল ৯০০ থেকে এক হাজার টাকা এবং নদীর পাঙাশ বিক্রি হচ্ছে ৯০০ থেকে এক হাজার ২০০ টাকায়।
এদিকে বাজারে উঠে গেছে প্রায় সব ধরনের শীতকালীন সবজিই। শীতের সবজির পসরা সাজিয়ে বসেছেন প্রায় সব দোকানিই। কিন্তু চাহিদা-জোগানের অজুহাত দিয়ে প্রতি সপ্তাহেই বাজারে ওঠানামা করছে দাম।
বিক্রেতারা বলছেন, শীতের সবজি এখনো বাজারে পর্যাপ্ত পরিমাণে আসছে না। এতে দাম ওঠানামা করছে।
বাজারে মানভেদে প্রতি কেজি বেগুন ৭০-৮০ টাকা, করলা ৮০ টাকা, ঢ্যাঁড়শ ৬০ টাকা, বরবটি ৮০ টাকা, মুলা ৩০ টাকা, লতি ৭০ টাকা, কহি ৬০ টাকা, ধুন্দুল ৫০ টাকা ও পটোল ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর প্রতি কেজি পেঁপে ৪০ টাকা, গাজর ১৩০ টাকা, কচুরমুখী ১০০ টাকা, টমেটো ১২০ টাকা, শিম ৮০ টাকা, শালগম ৬০ টাকা ও শসা বিক্রি হচ্ছে ৪০-৫০ টাকায়। এছাড়া প্রতি কেজি ধনেপাতা ৪০-৬০ টাকা, পেঁয়াজের কালি ৫০-৬০ টাকা ও চিচিঙ্গা বিক্রি হচ্ছে ৪০-৫০ টাকায়। আর মানভেদে প্রতি পিস ফুলকপি ৪০ টাকা, বাঁধাকপি ৫০ টাকা এবং লাউয়ের জন্য গুনতে হচ্ছে ৫০-৭০ টাকা।
বাজারে লালশাকের আঁটি ১০ টাকা, পাটশাক ১০-১৫ টাকা, পুঁইশাক ৩০-৪০ টাকা, মুলাশাক ১০ টাকা, ডাঁটাশাক ১০-১৫ টাকা, কলমিশাক ১০ টাকা ও পালংশাক বিক্রি হচ্ছে ১৫-২০ টাকায়। আর খুচরা পর্যায়ে কাঁচা মরিচ বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকায়, যা পাইকারিতে বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৭০-৮০ টাকা দরে। বিক্রেতারা বলছেন, বাজারে সরবরাহ বেড়েছে কাঁচা মরিচের। এতে পাইকারি ও খুচরা উভয় পর্যায়েই কমেছে দাম।
এদিকে, সোনালি ও ব্রয়লার মুরগির দাম কিছুটা কমলেও স্থিতিশীল রয়েছে অন্যান্য মাংস ও ডিমের দাম। কেজিতে ১০ টাকা কমে প্রতিকেজি সোনালি মুরগি ২৯০ থেকে ৩০০ টাকা ও ব্রয়লার মুরগি ১৭৫-১৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এ ছাড়া প্রতি কেজি দেশি মুরগি ৫৫০-৬০০ টাকা, সাদা লেয়ার ২৩০ টাকা ও লাল লেয়ার বিক্রি হচ্ছে ২৮০ টাকায়। আর জাতভেদে প্রতি পিস হাঁস বিক্রি হচ্ছে ৫৫০-৬০০ টাকায়।
অপরিবর্তিত আছে গরু ও খাসির মাংসের দামও। প্রতি কেজি গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে ৭৫০-৮০০ টাকায়। এ ছাড়া প্রতি কেজি খাসির মাংস এক হাজার ৫০ টাকা থেকে এক হাজার ১০০ টাকা এবং ছাগলের মাংস বিক্রি হচ্ছে এক হাজার টাকায়।
আর বর্তমানে প্রতি ডজন লাল ডিম খুচরা পর্যায়ে ১৪৪-১৪৫ টাকা ও সাদা ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৪৪ টাকায়। আর প্রতি ডজন হাঁসের ডিম ২৪০-২৫০ টাকা ও দেশি মুরগির ডিম বিক্রি হচ্ছে ২৪০ টাকায়।
নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত বাজার মনিটরিংয়ের দাবি ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়েরই। ক্রেতারা বলছেন, নিয়মিত বাজার মনিটরিং করা হয় না। এতে বিক্রেতারা ইচ্ছামতো দাম বাড়ানোর সুযোগ পান।
আর বিক্রেতারা বলছেন, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ইচ্ছামতো দাম বাড়াচ্ছেন। বাজারে নিয়মিত অভিযান চালালে অসাধুদের দৌরাত্ম্য কমবে।
রাজধানীর কারওয়ানবাজারের ইলিশ বিক্রেতা মো. শুকুর আলী বলেন, ইলিশ কম ধরা পড়ছে। এতে বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ায় দাম বাড়ছে। দিন দিন ইলিশের দাম ভোক্তার নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। এতে কমছে বিক্রিও।
আর ক্রেতারা বলছেন, দিনকে দিন যেভাবে দাম বাড়ছে ইলিশের, তাতে ইলিশ কেনাই দুরূহ হয়ে পড়বে।
মিজানুর নামে এক ক্রেতা বলেন, গত সপ্তাহেও ইলিশের কেজি ছিল ১৭০০-১৮০০ টাকা। সেটি এখন বিক্রি হচ্ছে ২২০০ টাকায়। এভাবে দাম বাড়লে ইলিশ কেনাই মুশকিল।
কেরানীগঞ্জের আগানগর বাজারের সবজি বিক্রেতা উজ্জ্বল বলেন, বাজারে এখন সবজির দাম ওঠানামা করছে। এক সপ্তাহ কমলে, পরের সপ্তাহে বাড়ে। মূলত সরবরাহ কম-বেশির কারণে দামের এই ওঠানামা।
আর কারওয়ানবাজারের সবজি বিক্রেতা নূরুল ইসলাম বলেন, সপ্তাহ ব্যবধানে কোনো কোনো সবজিতে পাঁচ থেকে ১০ টাকা কমলেও কোনটিতে আবার বেড়ে গেছে। প্রতি সপ্তাহেই দাম ওঠানামা করছে। পুরোদমে শীতের সবজি না আসা পর্যন্ত বাজারে এই অস্থিরতা থাকবেই।
তবে ক্রেতাদের দাবি, শীতের সবজি আসতে শুরু করলেও দাম কমছে না আশানুরূপভাবে।
সাইদুল নামে এক ক্রেতা বলেন, শীতকালীন সবজিতে বাজার ভর্তি। তবু নাগালে আসছে দাম। বাজারে কারসাজি চলছে।
মুরগি ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাজারে সরবরাহ বাড়ায় কমেছে ব্রয়লার ও সোনালি মুরগির দাম।
রাজধানীর কারওয়ানবাজারের মুরগি ব্যবসায়ী হাকিম বলেন, বাজারে সরবরাহ বেড়েছে। এতে দাম কমেছে। তবে ইতোমধ্যে বিয়ের মৌসুম শুরু হয়ে গেছে; দাম কতদিন কম থাকবে বলা যাচ্ছে না। চাহিদা বাড়লে দামও বেড়ে যেতে পারে।
পলাশী বাজারের সবজি বিক্রেতা তানভির বলেন, শীতকালীন সবজি বাজারে আসতে শুরু করেছে। ফলে শিম, বেগুন, কপি ও মুলার দাম কিছুটা কমেছে। অন্যদিকে কচুরমুখীর দাম বেড়েছে। তবে আশা করা যায়, ১০ থেকে ১২ দিনের মধ্যে সবজির দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আসবে।
সরকারি চাকরিজীবী তবিবুর রাজধানীর কাঁঠালবাগানের বাসিন্দা। নিউমার্কেটে বাজার করতে এসে তিনি বলেন, এক মাস ধরে বেশিরভাগ সবজির দাম ৬০ থেকে ১০০ টাকার মধ্যে। ভেবেছিলাম ৫০ থেকে ৬০ টাকার মধ্যে সব সবজি চলে আসবে; কিন্তু দু-একটি ছাড়া বেশিরভাগ নাগালের বাইরে।
মগবাজারে সাব্বির আহমেদ নামে এক ক্রেতা বলেন, আলুর বাজার লাগাম ছাড়িয়েছে গত বছরই। চলতি বছরের মাঝামাঝিতে দাম কিছুটা কম থাকলেও বর্তমানে ফের বাড়তে শুরু করেছে। কমছে না নতুন আলুর দামও।
বিক্রেতারা বলছেন, বাজারে পুরনো আলুর সংকট চলছে। এতে নতুন-পুরনো কোনো আলুরই দাম কমছে না। কারওয়ান বাজারের পাইকারি আলু বিক্রেতা রুবেল জানান, পাইকারিতে প্রতি পাল্লা পুরনো আলু বিক্রি (পাঁচ কেজি) হচ্ছে ৩৫০-৩৬০ টাকায়। এতে প্রতি কেজির দাম পড়ছে ৭০-৭২ টাকা। মূলত সরবরাহসংকটের কারণেই দাম বাড়তি।
আর আড়তদারদের দাবি, বাজারে আলুর সংকট চলছে। কোল্ড স্টোরেজগুলো থেকে পর্যাপ্ত আলু পাওয়া যাচ্ছে না। এতে দাম বাড়ছে। তবে ভারত থেকে আলু আমদানি চলমান থাকায় দাম নতুন আলুর দাম কমছে। ভোক্তা অধিকার কোল্ড স্টোরেজগুলোতে অভিযান চালালে দাম আরো কমতো।
কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, শুল্ক ছাড় দেওয়ার কারণে সরকারের রাজস্ব আয় কমবে। তবে এর সুফল ক্রেতা পাচ্ছেন কিনা তা খতিয়ে দেখতে হবে সরকারকে। অতীতে দেখা গেছে, শুল্কছাড়ের সুযোগ আমদানিকারকদের পেটে গেছে। সাধারণ ক্রেতা বঞ্চিত থেকেছেন। এ জন্য বাজার তদারকি ও পণ্যের সরবরাহ বাড়ানোর প্রতি জোর দেন তিনি।
আমারবাঙলা/এমআরইউ