রাজশাহীর ঈদ মেলায় বাঘা দরগা শরিফের গেটের সামনে সিদ্দিক কবিরাজের (৫৭) পানের দোকান। তার এক খিলি পানের সর্বোচ্চ দাম ১৫৭৫ টাকা; আর সর্বনিম্ন ১০ টাকা। তিনি ৩৮ বছর ধরে ব্যবসা করে আসলেও ঐতিহ্যবাহী ঈদ মেলায় ৩০ বছর ধরে খিলি পানের ব্যবসা করে আসছেন।
সিদ্দিক কবিরাজ নাটোরের লালপুর উপজেলার জয়রামপুর গ্রামের মৃত গরিবউল্লার ছেলে। হরেক রকম জর্দ্দা ও মসলা দিয়ে তৈরি করেন বিভিন্ন স্বাদের পান। বাহারি এই পান খেতে দূরদূরান্ত থেকে লোক আসে সিদ্দিক কবিরাজের দোকানে।
অভাব অনোটনসহ অর্থনৈতিক ব্যাপক অসচ্ছলতায় তাকে বাধ্য করেছে পান বিক্রি করতে।
বড় ধরনের ব্যবসা করতে মোটা অংকের পুঁজির প্রয়োজন। তার সাধ থাকলেও সাধ্যের বাইরে ছিল সে স্বপ্ন। ১৯৮৭ সালে স্বল্প পুজি নিয়ে শুরু করেন পান বিক্রি। পানের দোকানদারী করে সিদ্দিক কবিরাজ এখন স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছেন।
তিনি এই মেলায় ছয় দিনে লাখ টাকার খিলি পান বিক্রি করেছেন। মেলায় ভালোবাসার পান ৩৩৫ টাকা মূল্যে তিন খিলি বিক্রি করছেন। তার পানের দোকানের লাইসেন্স (নম্বর ১৮৬৭) রয়েছে। সিদ্দিক কবিরাজ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পানের খিলি ব্যবাসায়ী। তার দোকানের সাইনবোর্ডে লিখা আছে, আপন জনের জন্য নিয়ে যাবেন— ভালো লাগলে দাম দেবেন, না লাগলে দেবেন না।
সিদ্দিক কবিরাজ এই মাসে প্রায় এক লাখ ২০ হাজার টাকার পান বিক্রি করেছেন। এর মধ্যে তিনি এই মেলায় প্রায় লাখ টাকার খিলি পান বিক্রি করেছেন। বিভিন্ন পণ্যের দামসহ যাবতীয় খরচ বাদ দিয়ে প্রতি মাসে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা আয় হয়।
তিনি জানান, মেয়ে শিখা খাতুনকে মাস্টার্স শেষ করার পর বিয়ে দিয়েছেন। ছেলে শান্ত হোসেন স্থানীয় স্কুল থেকে এবার এসএসসি পরীক্ষা দেবেন। তিনি নিজে অর্থনৈতিক সংকটের কারণে খুব বেশি লেখাপড়া করতে পারেননি। তবে টাকার অভাবে যেন ছেলের পড়াশুনা বন্ধ না হয়ে যায়, সে ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতন রয়েছে সিদ্দিক কবিরাজ। মেয়ের মতো ছেলেকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখছেন সিদ্দিক কবিরাজ।
সিদ্দিক কবিরাজের দোকানে পানের মূল্য তালিকার মধ্যে নবাব পান এক হাজার ৫৭৫ টাকা, জমিদার পান এক হাজার ৫০ টাকা, নাটোরের বনলতা পান এক হাজার ৫৭৫ টাকা, আর্য়ুবেদিক পান ৯৯৫ টাকা, বিয়াই-বিয়ান পান ৮৮৫ টাকা, শালি-দুলাভাই পান ৭৭৫ টাকা, হাসি-খুশি পান ৫৫৫ টাকা, নতুন বাবুর হাতের পান ৪৪৫ টাকা, ভালোবাসার পান ৩৩৫ টাকা, বন্ধু-বান্ধবীর পান ২৫ টাকা ও জনতার পান ১০ টাকা।
শুক্রবার (৪ এপ্রিল) ঝিনাইদহ থেকে মেলায় ঘুরতে এসে তিন বন্ধু ভালোবাসার পান ৩৩৫ টাকায় তিনটি নেন। এ সময় তারা বলেন, এর আগেও তার কাছে থেকে পান খেয়েছি। তার পান খেলে মনে হয় মুখ থেকে পান ফুরাচ্ছে না। খেতে খুব মজা।
মেলায় ঘুরতে আসা তসলিম উদ্দিন বলেন, দীর্ঘ দিন থেকে এই মেলায় পান বিক্রি করে আসছেন সিদ্দিক কবিরাজ। তার পান খাওয়ার জন্য মানুষ লাইন নিয়ে থাকেন। বিক্রিও ভালো হয়।
সিদ্দিক কবিরাজ বলেন, আমি দেশের বিভিন্ন জেলায় পান বিক্রি করি। স্থানীয়ভাবে ব্যবসা করি না। ভ্রাম্যমাণ হিসেবে এ ব্যবসা করে আসছি। যেখানে বড় বড় মেলা বা অনুষ্ঠান হয় সেখানে যাই। এভাবে দীর্ঘ ৩৮ বছর চলছে। আমার সাত ভাই বোনের মধ্যে আমি বড়। বাবা ১১ বছর আগে মারা গেছেন। বর্তমানে বৃদ্ধ মাসহ পাঁচ সদস্যের পরিবারের দায়িত্ব আমার কাঁধে।
আমারবাঙলা/এমআরইউ