ঈদযাত্রার চতুর্থ দিনে নাড়ীর টানে বাড়ির পানে ছুটে চলা মানুষের ভিড় বেড়েছে সড়ক, রেলপথ ও নৌপথে। যদিও বেশ নির্বিঘ্নেই বৃহস্পতিবার (২৭ মার্চ) ঢাকা ছাড়েন নগরবাসী। টিকিট ছাড়া প্লাটফর্মে প্রবেশাধিকার না থাকায় এবারের রেলপথে ভোগান্তি কম বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সড়কপথের যাত্রী সাধারণের মধ্যেও রয়েছে স্বস্তির ছাপ। এদিকে ঘরমুখো মানুষের পদচারণা বেড়েছে রাজধানীর সদরঘাটে। সারাবছর নৌপরিবহন শ্রমিকরা অলস সময় পার করলেও ঈদ উপলক্ষে বেড়েছে ব্যস্ততা। হাঁকডাকে লঞ্চঘাটে ফিরেছে প্রাণচাঞ্চল্য।
অনেকে বলছেন, সরকারের নানামুখী উদ্যোগের কারণে এবারের ঈদযাত্রায় মানুষের ভোগান্তি অনেক কমে এসেছে। কেউ কেউ বলছেন, বড় ছুটি মেলায় ঈদযাত্রা স্বস্তির হচ্ছে। এদিকে ঈদযাত্রাকে নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ করতে সার্বক্ষণিক কাজ করে যাচ্ছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
অন্যদিকে ঈদের ছুটির আগে বৃহস্পতিবার শেষ কর্মদিবস ছিল। এদিন রাজধানীতে যাজট দেখা গেছে। পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে টানা নয় দিনের সরকারি ছুটি শুরু হচ্ছে শুক্রবার (২৮ মার্চ)।
কমলাপুরে ঘরমুখো মানুষের ভিড়: বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর কমলাপুর রেলস্টেশনে দেখা যায়, শহরের ব্যস্ততা ফেলে পরিবারের সঙ্গে ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে রাজধানী ছাড়েন মানুষ। দিন যতই ঘনিয়ে আসছে স্টেশনে বাড়ছে যাত্রীর ভিড়। যদিও এখন পর্যন্ত চিরচেনা উপচেপড়া ভিড় চোখে পড়েনি স্টেশনের প্লাটফর্মে। তাইতো যাত্রীদের চোখেমুখে স্বস্তি বিরাজ করছে।
সকাল থেকে নিয়ম মেনে কমলাপুর রেলস্টেশন ছাড়ে প্রতিটি ট্রেন। যদিও বাড়তি চাপ সামাল দিতে বৃহস্পতিবার থেকেই চালু হয় পাঁচ জোড়া ঈদ স্পেশাল ট্রেন। এর বাইরেও রেলের আন্তঃনগর ট্রেনগুলোর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে বাড়তি ৪৪টি নতুন কোচ।
যাত্রী ভোগান্তি কমাতে টিকিট ছাড়া প্লাটফর্মে প্রবেশ এবং ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ ঠেকাতে কমলাপুরের পাশাপাশি জয়দেবপুর ও বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশনেও তৎপর রয়েছে প্রশাসন।
কমলাপুর রেলস্টেশনের ম্যানেজার শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনটি সোয়া এক ঘণ্টা দেরিতে ছেড়েছে। রূপসী বাংলা এক্সপ্রেস ট্রেনটিও আধা ঘণ্টা দেরিতে ছেড়ে যায়। মূলত ঢাকায় ফিরতে দেরি হওয়ায় সামান্য এই বিলম্ব। তবে ঢাকা থেকে দ্রুত ছেড়ে দিচ্ছি।’
সড়কে চাপ বাড়ছে: এদিকে, গত কয়েকদিনের তুলনায় সড়কে যাত্রীর চাপ বাড়লেও নেই দৃশ্যমান ভিড়। অলস সময় কাটান কাউন্টারগুলোর কর্মীরা। কেউ কেউ আবার হাক-ডাক দিয়ে ডাকেন যাত্রী। ঠিক সময়ে বাস ছাড়ায় স্বস্তি প্রকাশ করেন যাত্রীরা। তারা বলেন, অনলাইনে টিকিট পাওয়ায় ভোগান্তি কমেছে। ফলে আনন্দও দ্বিগুণ বেড়েছে।
ট্রেনের টিকিট কালোবাজারি, গ্রেপ্তার ৬: ঈদযাত্রায় ট্রেনের টিকিট কালোবাজারি চক্রের মূলহোতাসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব-৩)।
এ সময় দেশের বিভিন্ন গন্তব্যের ৩১৪টি আসনের ৮২টি টিকিট ও বিপুল পরিমাণ মোবাইল সিম উদ্ধার করা হয়েছে আসামিদের কাছ থেকে।
বৃহস্পতিবার ঢাকা শাহজাহানপুরের ঝিলপাড়ে অবস্থিত র্যাব-৩-এর কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব জানান উপ-অধিনায়ক মেজর মোহাম্মদ সাকিব হোসেন।
বুধবার ও বৃহস্পতিবার রাজধানীর খিলগাঁও, বনশ্রী, ডেমরা ও কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে অভিযান পরিচালনা করে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তাররা হলেন- মো. রিয়াজুল ইসলাম (২৯), মো. সেলিম (৫৩), সোহেল মিয়া (৩৬), তৌফিক (২৮), মাইনুল ইসলাম (২৪) ও রাকাতুল ইসলাম (১৯)।
মেজর মোহাম্মদ সাকিব হোসেন বলেন, সম্প্রতি বেশ কিছু দুষ্কৃতকারী ও টিকিট কালোবাজারি চক্রের দৌরাত্ম্যে স্বস্তিকর রেলভ্রমণের টিকিট প্রাপ্তি অনেক সাধারণ জনগণের জন্য অস্বস্তি, চিন্তা ও ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনলাইনে টিকিট পাওয়া না গেলেও কালোবাজারে বেশি মূল্যে টিকিট বিক্রি হতে দেখা যায়। কালোবাজারিরা বিভিন্ন কৌশলে ট্রেনের টিকিট অগ্রিম সংগ্রহ করে অবৈধভাবে নিজেদের কাছে মজুদ করে রেখে সাধারণ যাত্রীদের কাছে দুই থেকে তিন গুণ বেশি দামে বিক্রি করছে।
তিনি বলেন, গোয়েন্দা সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় র্যাব-৩-এর একটি অভিযানিক দল বুধবার রাতে রাজধানীর খিলগাঁও বনশ্রী এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানে ট্রেনের টিকিট কালোবাজারি চক্রের সদস্য মো. রিয়াজুল ইসলামকে (২৯) গ্রেপ্তার করা হয়। পরে রিয়াজুলের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার ভোররাতে র্যাব-১১-এর সহায়তায় অপর একটি অভিযানে কালোবাজারি চক্রের মূলহোতা মো. সেলিমকে (৫৩) রাজধানীর ডেমরা থানার ডগাইর বাজার এলাকা হতে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তারদের কাছ থেকে দেশের বিভিন্ন গন্তব্যের সর্বমোট ৩১৪টি সিটের ৮২টি ট্রেনের টিকিট, বিভিন্ন মোবাইল কোম্পানির ৯৫টি সিম, ১০টি মোবাইল ফোন, একটি এনআইডি, একটি ঘড়ি, চারটি এটিএম কার্ড, একটি সিপিইউ, একটি মনিটর, একটি কী-বোর্ড, একটি মাউস এবং নগদ ৭১০ টাকা উদ্ধার করা হয়। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে স্বস্তির ঈদযাত্রা: ঈদযাত্রায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জ অংশে যানবাহনের বাড়তি চাপ থাকলেও যান চলাচল স্বাভাবিক ছিল। ফলে স্বজনদের সঙ্গে ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি করতে যাওয়া ঘরমুখো মানুষ নির্বিঘ্নে নিজ গন্তব্য পৌঁছাতে পেরেছেন।
বৃহস্পতিবার সকাল থেকে মহাসড়কের সাইনবোর্ড থেকে মেঘনা টোলপ্লাজার ২১ কিলোমিটার সড়ক পর্যন্ত কোথাও কোনো যানজটের ভোগান্তি হয়নি বলে জানা গেছে।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, দূরপাল্লাসহ আঞ্চলিক বাসগুলো স্বল্প সময়ের মধ্যে প্রতিটি বাসস্ট্যান্ডে গাড়ি থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা শেষে স্থান ত্যাগ করেছে। এতে করে সড়কে যানবাহনগুলোর জটলা সৃষ্টি হয়নি। ফলে যাত্রী এবং গাড়িচালকরাও স্বস্তিতে নিজ নিজ গন্তব্যে যেতে পেরেছেন।
এদিকে মহাসড়ক যানজটমুক্ত রাখতে হাইওয়ে ও থানা পুলিশ তৎপর রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট এরিয়ার কর্মকর্তারা। একইসঙ্গে পুলিশের সহযোগিতায় র্যাব সদস্যদের মহাসড়কে অবস্থান নিতে দেখা গেছে।
মহাসড়কের পরিস্থিতির বিষয়ে শিমরাইল হাইওয়ে পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ আবু নাঈম বলেন, এবারের ঈদযাত্রায় মানুষের ভোগান্তি এড়াতে আমাদের অতিরিক্ত ফোর্স কাজ করছে। ঈদ উপলক্ষে আমরা দিবারাত্রি ডিউটি করে যাচ্ছি। আশা করছি যানজটের ভোগান্তি থেকে ঘরমুখো মানুষকে মুক্ত করতে পারবো।
কাঁচপুর হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাজী ওয়াহিদ মোরশেদ বলেন, যানজট নিরসনে আমরা তৎপর রয়েছি। টহল টিমও বাড়ানো হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ অংশে মানুষকে যানজটের ভোগান্তিতে পড়তে হবে না বলে আশাবাদী।
সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শাহিনূর আলম বলেন, আমাদের একটি টিম ২৪ ঘণ্টার জন্য চিটাগাংরোড রাখা হয়েছে। পাশাপাশি আরেকটি টিমও দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে এক টিম সিএনজি এবং আরেকটি পুলিশের গাড়িতে ডিউটি করছেন। মানুষের জানমালের নিরাপত্তায় আমরা সতর্ক আছি।
সোনারগাঁ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মফিজুর রহমান জানান, ঘরমুখো মানুষের ঈদযাত্রা স্বস্তির করতে আমাদের থানা থেকে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মহাসড়কে কাজ করে যাচ্ছে। কাঁচপুর থেকে মেঘনা টোলপ্লাজা পর্যন্ত আমরা করছি। পাশাপাশি বৃহস্পতিবার থেকে আমাদের সঙ্গে আনসার সদস্যরাও কাজ করছেন। জনগণ যাতে নির্বিঘ্নে যাতায়াত করতে পারে সেজন্য আমরা সর্বদা তৎপর রয়েছি।
উত্তরাঞ্চলবাসীর ভোগান্তি বাড়ছে: ঈদ সামনে রেখে রাজধানী ঢাকা ছাড়তে শুরু করেছেন বগুড়াসহ উত্তরাঞ্চলের মানুষ। কিন্তু এবারের ঈদযাত্রা কতটা সুবিধাজনক হবে এ নিয়ে চিন্তা ঘরে ফেরা মানুষের। তাদের দাবি, দেশের সাম্প্রতিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কারণে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি বেড়ে যাওয়ায় ঢাকা-উত্তরবঙ্গ মহাসড়কে বাড়ছে ভোগান্তি। এ ছাড়া ঈদের সময় বিভিন্ন চক্র যেমন মলম পার্টি, গামছা পার্টির আবির্ভাব হয়। বিশেষ করে মলম পার্টির প্রাদুর্ভাব ঈদের সময় বেশি দেখা যায়। তারা খাবারের মধ্যে নেশাজাতীয় বা চেতনানাশক দ্রব্য মিশিয়ে মানুষকে অজ্ঞান করে অর্থ, মোবাইল ফোন এবং প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র হাতিয়ে নেয়।
সব মিলিয়ে নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারবেন কিনা এ নিয়ে শঙ্কায় ঘরমুখো মানুষ। হাইওয়ে পুলিশ রিজিয়ন বগুড়ার পুলিশ সুপার শহিদ উল্লাহ বলেন, মহাসড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রায় ৫০০ পুলিশ সদস্য নিযুক্ত আছেন।
নারায়ণগঞ্জের মহাসড়কে র্যাবের টহল-তল্লাশি: ঘরমুখী মানুষের ঈদযাত্রা নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক রাখতে নারায়ণগঞ্জে মহাসড়কগুলোতে টহল ও তল্লাশি কার্যক্রম শুরু করেছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ান র্যাব-১১। ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট মহসড়কের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে তাদের এই কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে জেলার সোনারগাঁয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কাঁচপুর সেতুর পাশে চেকপোস্টে তল্লাশির মাধ্যমে এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন র্যাব-১১ ব্যাটেলিয়ান অধিনায়ক লে. কর্নেল এইচ এম সাজ্জাদ হোসেন।
এ সময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘মহাসড়কগুলোকে সাধারণ মানুষের চলাচলের জন্য নিরাপদ রাখতে র্যাব বছরজুড়েই চেকপোস্টে তল্লাশি ও টহল কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। তবে এবারের ঈদুল ফিতর উপলক্ষে দীর্ঘ সময়ের ছুটির কারণে এ কার্যক্রম আরো জোরদার করা হয়েছে। মহাসড়কে কোনো যানবাহন বা যাত্রী যাতে ছিনতাই বা ডাকাতির কবলে না পড়ে, সে বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে র্যাব নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। চেকপোস্টে তল্লাশির পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে।’
এবারের ঈদযাত্রা মানুষের জন্য নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক হবে বলে আশা প্রকাশ করেন র্যাব-১১ ব্যাটেলিয়ানের অধিনায়ক লে. কর্নেল এইচ এম সাজ্জাদ হোসেন।
গাজীপুরের দুই মহাসড়কে নেই যানজট: ঈদযাত্রায় গাজীপুরের দুটি মহাসড়ক ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে বৃহস্পতিবার কোথাও যানজটের খবর পাওয়া যায়নি। এদিন দুপুর ১২টার দিকে গাজীপুরের দুটি মহাসড়ক ঘুরে নির্বিঘ্নে মানুষকে ঈদযাত্রা উপভোগ করতে দেখা গেছে।
উত্তর ও উত্তর পশ্চিমাঞ্চলসহ দেশের ৩১টি জেলার মানুষের রাজধানী ও গাজীপুরে প্রবেশের দ্বার হলো ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা-টাঙ্গাইল। ফলে এই মহাসড়কগুলো দিয়ে প্রতিদিন লাখ লাখ পণ্য ও যাত্রীবাহী যানবাহন চলাচল করে। ঈদের সময় এই সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। ফলে এ সময়ে যানজটে আটকে চরম ভোগান্তিতে পরেন মানুষ। তবে এবারের ঈদযাত্রার চিত্র পুরো ব্যতিক্রম। মোড়ে মোড়ে নেই অতিরিক্ত বাসের চাপ, নেই চিরচেনা যানজট, নেই পরিবহন সংকট। বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টায় গাজীপুরের দুটি মহাসড়ক ঘুরে এসব চিত্র দেখা গেছে।
উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার খ্যাত গাজীপুরের চন্দ্রা ত্রিমোড় এলাকায় বৃহস্পতিবার সকাল থেকে ঈদ যাত্রার ঘরমুখী মানুষের চাপ বেড়েছে। চন্দ্রা কেন্দ্রী কিছুটা যানবাহনের জটলা থাকলেও মহাসড়কের কোথাও কোনো যানজটের খবর পাওয়া যায়নি। যাত্রীর জন্য বাসগুলোকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে দেখা গিয়েছে। তবে বরাবরের মতো এবারো অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন যাত্রীরা।
অপরদিকে, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের চান্দনা চৌরাস্তা থেকে জৈনাবাজার পর্যন্ত গাজীপুর অংশের প্রায় ৩৫ কিলোমিটার মহাসড়কেও কোথাও কোনো যানজট বা যাত্রী দুর্ভোগের খবর পাওয়া যায়নি। চালক ও পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মহাসড়কের এই অংশের কয়েকটি মোড়ে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে যাত্রী উঠানামা করানোর কারণে অতিরিক্ত যাত্রী চাপে যানজটের সৃষ্টি হয়, বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত যানজটের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
নাওজোর হাইওয়ে পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রইছ উদ্দিন বলেন, মহাসড়কে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। তবে কখনো কখনো জটলার সৃষ্টি হলেও তাতে খুব একটা সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে না। যানজট নিরসনে পুলিশের ৩০০ এবং জেলা পুলিশের ৩০০ সদস্য তিন শিফটে দায়িত্ব পালন করছেন।
গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) অশোক কুমার পাল বলেন, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে গাজীপুর অংশে কোথাও যানজট নেই। যানজট রোধে মহানগর পুলিশের ব্যাপক প্রস্তুতি রয়েছে।
ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু সড়কে স্বস্তির ঈদযাত্রা: সড়ক পথে ঈদযাত্রার চতুর্থ দিনে ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়কে ঘরমুখো মানুষ ও যানবাহনের চাপ প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। তবে যানজট না থাকায় স্বস্তিতে বাড়ি ফিরছে উত্তরাঞ্চলের মানুষ।
এদিকে, বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ডে যাত্রীরা কয়েক ঘণ্টা ধরে বাসসহ গণপরিবহনের জন্য অপেক্ষা করেন। এ সুযোগে যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করে পরিবহন সংশ্লিষ্টরা। এতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন যাত্রীরা।
যমুনা সেতু টোল প্লাজা সূত্র জানায়, স্বাভাবিক সময়ে ২৪ ঘণ্টায় ১৮ থেকে ২০ হাজার যানবাহন যমুনা সেতু পারাপার হয়। ঈদকে কেন্দ্র করে এ চাপ বেড়ে যায় কয়েকগুণ। গত মঙ্গলবার রাত ১২টা হতে বৃহস্পতিবার সকাল ১১ পর্যন্ত ৩৫ ঘণ্টায় ৪৭ হাজার ১৮০টি যানবাহন সেতু পারাপার হয়েছে। এতে টোল আদায় হয়েছে তিন কোটি ৯৬ লাখ ৮৩ হাজার ৫৯০ টাকা।
মহাসড়কের নগরজলফৈ, রাবনা, এলেঙ্গাসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ঈদযাত্রায় টাঙ্গাইলের মহাসড়কে পরিবহনের সংখ্যা বাড়ছে। উত্তরবঙ্গগামী লেনে বাস, ব্যক্তিগত যানবাহনসহ অন্যান্য পরিবহনের চাপ প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। যানবাহনের চাপ বাড়লেও উত্তরবঙ্গের মানুষের ঈদযাত্রা স্বস্তিতে রয়েছেন। কোনো ভোগান্তি ছাড়াই পরিবহনগুলো চলাচল করছে স্বাভাবিক গতিতে।
যমুনা সেতু সাইট অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী আহসানুল কবীর পাভেল জানান, মহাসড়কে যানজট নিরসনে যমুনা সেতু পূর্ব ও পশ্চিম উভয় অংশে আলাদা দুটি মোটর সাইকেলের লেন, ১৮টি টোল বুথ, মোটরসাইকেলের জন্য চারটি বুথ স্থাপন করা হয়েছে। মহাসড়কে যানবাহনের চাপ বাড়লেও যানজট নেই।
কালিহাতী সার্কেলের ইন্সপেক্টর মো. মাহবুবুর রহমান জানান, কয়েক দিনের তুলনায় বৃহস্পতিবার যানবাহনের চাপ অনেকটা বেড়েছে। দুপুরের পর চাপ আরো বেড়েছে। তবে কোথাও যানজট না থাকায় উত্তরের মানুষ স্বস্তিতে বাড়ি ফিরতে পারছে।
টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান জানান, ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়কে প্রায় সাড়ে ৭০০ পুলিশ দায়িত্ব পালন করছে। এরমধ্যে মোবাইল টিম, মোটরসাইকেল টিম দায়িত্ব রয়েছে। মহাসড়কে চারটি সেক্টরে ভাগ করা হয়েছে। মহাসড়কে বিকল যান অপসারণের জন্য ছয়টি রেকারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এখন পর্যন্ত যানজটের সৃষ্টি হয়নি।
১২ ঘণ্টায় পদ্মা সেতুতে এক কোটি ৪৬ লাখ টাকা টোল আদায়: ঈদের ছুটি এখনো শুরু না হলেও কর্মব্যস্ত নগরী রাজধানী ছেড়ে নাড়ির টানে বাড়ি ফেরা মানুষের ভিড় বেড়েছে মুন্সীগঞ্জের মাওয়া প্রান্তের পদ্মা সেতুর টোল প্লাজা এলাকায়। আর তাই পদ্মা সেতুতে বেড়েছে টোল আদায়ও। গত বুধবার রাত ১২টা থেকে বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত ১২ ঘণ্টায় সেতুতে টোল আদায় হয়েছে এক কোটি ৪৬ লাখ ৬৮ হাজার ২০০ টাকা।
এ সময় মোট ১১ হাজার ৫১০টি পরিবহন পদ্মা সেতু হয়ে পারাপার হয়েছে। এর মধ্যে মাওয়া প্রান্ত হয়ে পদ্মা সেতু পাড়ি দিয়েছে সাত হাজার ১৭৫টি যানবাহন। আর জাজিরা প্রান্ত দিয়ে একই সময়ে চার হাজার ৩৩৫টি পরিবহন পদ্মা সেতু পাড়ি দিয়েছে। পদ্মা সেতুর সাইড অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু সাঈদ বিষয়টি নিশ্চিত করছেন।
বৃহস্পতিবার ভোর থেকে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা চাপ বৃদ্ধি পেলেও সেতু এলাকা ও হাইওয়েতে ছিল না কোনো ভোগান্তি। এতে উৎসবের আমেজ ও স্বস্তির হাসি ফুটেছে যাত্রীদের মুখে। ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে পদ্মা সেতুর মাওয়া প্রান্তের টোল প্লাজা এলাকায় সাতটি বুথে আদায় করা হচ্ছে যানবাহনের টোল। তবে মোটরসাইকেলের জন্য বরাবরের মতো এবারো রয়েছে আলাদাভাবে টোল নেওয়ার ব্যবস্থা।
সেতু কর্তৃপক্ষ বলছে, শুক্রবার যানবাহনের চাপ বৃদ্ধি পাবে সেতুতে। অন্যদিকে অনাকাক্সিক্ষত দুর্ঘটনা প্রতিরোধে ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে বিভিন্ন পয়েন্টে চেক পোস্ট বসিয়ে যানবাহনের অতিরিক্ত গতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালায় পুলিশ।
পদ্মা সেতুর সাইড অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু সাঈদ জানিয়েছেন, সেতুতে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় টোল আদায় বেড়েছে।
মুন্সীগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফিরোজ কবির জানান, এবার ঈদযাত্রায় পদ্মা সেতু হয়ে নির্বিঘ্নে বাড়ি ফিরছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার মানুষ। ঘরমুখো মানুষের যাত্রা নিরবচ্ছিন্ন করতে জেলাজুড়ে চার শতাধিক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। যানবাহন বিকল হয়ে পড়লে রেকার প্রস্তুত রাখা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে টহল টিমের ব্যবস্থা করা হয়েছে। মহাসড়কের স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে সন্তুষ্ট যাত্রীরা।
আমারবাঙলা/এমআরইউ